‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড়’

1389195466.সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সারাদেশে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিবেকবান ও সুস্থচিন্তার সাধারণ মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। তারা বলছেন, যশোর, দিনাজপুর, সুনামগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা একাত্তরের ববর্রতাকেও হার মানিয়েছে। এই ববর্রতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি আঘাত করা হয়েছে বলে তারা এর প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছেন। একইসঙ্গে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছেন তারা।
বুধবার বিবৃতি, মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা ওইসব হামলার প্রতিবাদ জানান। নেতারা এসব সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্তদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিপূর্ণ ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের নামে উপর্যুপরি অবরোধ-হরতাল ডেকে বিএনপি-জামায়াতের জোট সারাদেশে নজিরবিহীন সন্ত্রাস, হত্যা ও ধ্বংসের তাণ্ডব চালাচ্ছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে থেকেই তারা পেট্রোলবোমা ও ককটেল ছুড়ে পথচারী, বাস ও টেম্পো যাত্রী, কারখানা ও অফিসগামী খেটে খাওয়া মানুষ, পুলিশ, বাস ও ট্রাকচালক এমনকি স্কুলগামী শিশুদের যেভাবে হত্যা করছে, স্বাধীন বাংলাদেশে এর দ্বিতীয় নজির নেই।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ৬ জানুয়ারি নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী গত বছর ৫ মে ঢাকায় জামায়াত-হেফাজতের মহাতাণ্ডবের পর বলেছিলেন, ‘জামায়াত-হেফাজতকে আর ছাড় দেয়া হবে না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কথার মধ্যে কাজের মিল দেখতে চাই। এদিকে সহিংসতার বিরুদ্ধে কর্মসূচি গ্রহণের জন্য রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বুধবার বিকেলে ঢাকা মহানগর ১৪ দল বৈঠক করেছে।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘সহিংসতার মধ্য দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এখন আমাদের প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে চলতে হচ্ছে। বাতাসে ষড়যন্ত্রের গন্ধ, আগুনে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে মানুষ। জঙ্গিবাদের কাছে দেশ এখন জিম্মি। এরই ধারাবাহিকতায় যশোর-দিনাজপুর-সাতক্ষীরায় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। এর জন্য রাজনীতিবিদদের লজ্জিত হওয়া উচিৎ।’ এছাড়া বুধবার বিকেল ৪টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে বাসদ। সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মজীবী নারীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে মানববন্ধন। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংবাদিক মঞ্চ সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে বিক্ষুব্ধ জনতা নামের একটি সংগঠন বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সকাল ১২টায় এক সংবাদ সম্মেলন করেছে।
লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী-শিক্ষক-ছাত্র-শ্রমজীবী-পেশাজীবী-রাজনৈতিক কর্মীরা বিকেল সাড়ে ৩টায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার সুযোগে দৃশ্যত পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এবং তাদের ধর্মীয় স্থাপনায় আক্রমণের যে ঘটনা ঘটেছে, তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্টতম উদাহরণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি সত্ত্বেও সংখ্যালঘুদের ওপর এরূপ সহিংস ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ।’
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুজন)-এর সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এক যুক্ত বিবৃতিতে সংখ্যালঘুদের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা এবং জনপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তারা বলেন, আশা করি এ অপরাজনীতির সংস্কৃতির অবসানে প্রশাসন এবং দেশের সচেতন নাগরিকরা এগিয়ে আসবেন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মল্লিক সংখ্যালঘু ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা-আক্রমণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে বিবৃতিতে বলেছেন, বিএনপির ছত্রছায়ায় জামায়াত-শিবির এই পরিকল্পিত হামলা করছে। তারা সন্ত্রস্ত জনপদে আতঙ্কিত এসব মানুষের পাশে জনপ্রতিনিধিসহ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিকে দাঁড়ানোর এবং হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর পুনর্বাসনে উপযুক্ত সাহায্য প্রদানের জোর দাবি জানান।
বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট, নারীপক্ষ, সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, কর্মজীবী নারী, ক্ষেতমজুর সমিতি, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, বাংলাদেশ টেলিভিশন শিল্পী সমন্বয় পরিষদ, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু কবি আবৃত্তি সাংস্কৃতিক পরিষদ, সচেতন নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী শিল্পী পরিষদ, সম্মিলিত শিল্পী পরিষদ, রাধাগোবিন্দ জিও ঠাকুর মন্দির, রামসীতা মন্দির কমিটি সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে জড়িত দুষ্কৃতকারীদের শাস্তির দাবি করেছে।