আদুরীকে কষ্ট দেয়ার জন্য নিবেদিত সরকার …

মোমিন মেহেদী : মনে আছে নাগরিক জীবনে নতুন এক গল্পের নায়িকা আদুরীর কথা। যাকে কষ্টের টানে নিজেদের কাছে না রেখে বাসায় ঝিয়ের কাজ করতে দিয়েছিলেন তাঁর মা-বাবা আর ভাই। সেই আদুরী সংসারের সকল কাজ করার পরও তাঁর জুটেছিলো দু’বেলা পঁচা ভাত আর খুনতির ছেঁকা। সেই আদুরীদের জন্য নতুন কোন সমাধান নেই। সমাধান আনছে না বর্তমান মহাজোট সরকার। বরং আদুরীদেরকে ডাস্টবিনে জীবন্ত অথবা মৃত রাখার বন্দবস্ত করছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের শীর্ষ সকল লোকেরা।
অথচ গত ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর জুড়ে এই আমলা-মন্ত্রী আর নেতাদের মুখে ছিলো আদুরীর জন্য আহারে, উহুরে’র ঢল। ডাস্টবিন থেকে কুঁড়িয়ে পাওয়া গৃহকর্মী আদুরিকে চিকিৎসা শেষে তার মায়ের কাছে হস্তান্তর করেছিলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ডিএমসিএইচ) কর্তৃপক্ষ। তখনকার পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিলো, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান এক সংবাদ সম্মলনে আনুষ্ঠানিকভাবে আদুরিকে তার বিধবা মা সাফিয়া বেগমের কাছে হস্তান্তরকালে এ কথা জানান। পরিচালক বলেন, আদুরির চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার ও অধ্যাপকদের নিয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। যখন হাসপাতালে এসেছিল তখন দাঁড়াতে পারত না। এখন সে হাঁটতে পারে, দাঁড়াতে পারে। এটা দেখে আমার খুবই ভালো লাগছে। এ সময় হাসপাতালের পক্ষ থেকে আদুরিকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে বিভিন্ন রকম খেলনা, জামাকাপড় কিনে দেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. মুশফিকুর রহমান, আদুরির চিকিৎসা বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম মোস্তাক হোসেন তুহিন (সার্জারি বিভাগ), অধ্যাপক রাজিউল হক (নিউরো সার্জারি), ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) পরিচালক ডা. বিলকিস বেগম, অধ্যাপক চৌধুরী মো. আলী (চর্ম বিভাগ), অন্যান্য বিভাগের পরিচালকসহ হাসপাতালের চিকিৎসকরা। সাংবাদিকদের সামনে আদুরির মা সাফিয়া বেগম বলেন, অনেক পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন লোকের বাসাবাড়িতে কাজ করে। তাদের অবস্থা যাতে আদুরির মতো না হয়।যারা আদুরিকে নির্যাতন করেছে তাদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি। সাফিয়া বেগম বলেন, তার নয় ছেলেমেয়ে।অভাবের সংসার স্বামী নেই। তাই আদুরিকে কাজ করতে ওই বাসায় দিয়েছিলেন। তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
তার আগের ঘটনাটি কিন্তু ছিলো একদমই ভিন্ন। সেখানে দেখায় যায় ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩। রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ডিওএইচএস বারিধারার বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি ডাস্টবিন থেকে আদুরিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় তাকে। ডাস্টবিনে পড়ে থাকা শিশু আদুরির খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) তাকে স্থানান্তর করা হয়। এমন খবর হয়তো আর পত্রিকার পাতায় উঠে আসে না। তার মানে এই নয় যে, গৃহকর্মীরা খুব-ই আরামে আছে। তা নয়; বরং পত্রিকাগুলো এখন আর সেই সকল সংবাদ ছেপে বাহবা পেতে চায় না বলেই সংবাদগুলো রয়ে যায় সকলের আড়ালে। আড়ালে পড়ে থাকা সংবাদ নয়; আমরা বাস্তবতার স্বাদ চাই। আর একারনেই চাই গৃহকর্মীদের জন্য নীতিমালা, গৃহকর্তাদের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি হোক। যেখানে নির্যাতন বিরোধী কথা থাকবে। যেখানে নির্যাতন বন্ধের পরিক্রমা থাকবে। থাকবে সকল নির্যাতন প্রতিরোধের নীতিমালা। কিন্তু সেই চাওয়া থেকে যাচ্ছে অধরাই। কেননা, গত ৪ বছর ধরে ঝুলে আছে গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা। গৃহকর্মীদের সুরক্ষা দিতে এই নীতিমালার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখছে না। যার ফলে গৃহশ্রমিকরা স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। আর স্বীকৃতি না পাওয়ায় শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্তও হতে পারছেন না তারা। সরকারের উদাসীনতা ও গৃহশ্রমিকদের প্রতি অবহেলার কারণেই খসড়া ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’ হচ্ছে না। ২০১০ সালে গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে সরকার একটি খসড়া নীতিমালা করে। এরপর এক এক করে ৪ বছরে পেরিয়ে গেছে। কিন্তু খসড়া নীতিমালাটি অনুমোদন পায়নি। প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুমোদন পেলে, গৃহশ্রমিকরা আইনি অধিকার পেত। তারা শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃত পেত। আন্তর্জাতিক অধিকার পেত। এই নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদন না হওয়ায় গৃহশ্রমিকরা মজুরি নির্ধারণ, তাদের পরিচয়পত্র, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট, বিশ্রামের জন্য আলাদা সময় বরাদ্দসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারের আওতায় আনাও সম্ভব হচ্ছে না।
তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে যারা গৃহশ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন, তারাও দৃঢ় কোন ভূমিকা পালন করেন নি। আর একই কারনে সরকার এই বিষয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম-মিছিল-মিটিং-এর ধীর তাল লয়ের কথা শুনে কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি। অথচ প্রতিদিন গৃহকর্মীরা গ্রাম থেকে শহরে এসে নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। কিন্তু ওইসব শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে খসড়া একটি নীতিমালা প্রণয়ন করলেও চার বছরের মধ্যে তা অনুমোদন করেনি সরকার। আমি মনে করি গৃহশ্রমিকরা তাদের অধিকার চায়। তাদের শ্রমের মূল্যায়ন চায়। সরকার ২০১০ সালে গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণে একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল। গত ৪ বছরের মধ্যেও সরকার এই নীতিমালা অনুমোদন করেনি। যা আমাদের কাছে খুব দুঃখজনক বিষয়। অবিলম্বে ‘খসড়া গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১০’ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করতে সরকারের কাছে আহ্বান নতুন প্রজন্মের রাজনীতিক হিসেবে, নগন্য কলম সেনা হিসেবে। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও গৃহকর্মীদের অধিকার ও তাদের ন্যায্য সুযোগ- সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। গৃহকর্তার দ্বারা তারা বিভিন্ন সময় নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এটা খুব দুঃখজনক যে, গৃহশ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সরকার একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করলেও ৪ বছরের মধ্যে তা অনুমোদন করেনি। অবশ্য গৃহশ্রমিকদের অধিকার আদায়ে নারী আইনজীবী সমিতির এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১০ সালে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন জানিয়ে সালমা আলী বলেন, আদালতের নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না। এই নির্দেশনাও যদি মানা হতো তাহলেও শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা হতো। নির্দেশনা মানা হলে গৃহশ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশ শিশু পড়াশোনা, খেলাধুলা ও সময়ে সময়ে ছুটিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেত। দেশের প্রায় ২০ লাখেরও বেশি গৃহকর্মী সুরক্ষায় ২০১০ সালের আগস্টে খসড়া ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১০’ চূড়ান্ত করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু সমপ্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জানান, গৃহকর্মী সুরক্ষায় ও কল্যাণ নীতিমালা মন্ত্রিসভায় উপস্থানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে অতিদ্রুতই এই নীতিমালা অনুমোদন হবে।
সংবাদপত্র ও বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত বিভিন্ন তত্য থেকে জানা যায়, শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষায় শ্রম আইন-২০০৬ বলবৎ থাকলেও এই আইনে গৃহকর্মী বা গৃহশ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৩, ২৪ ও ২৫ অনুচ্ছেদে শ্রমিকদের মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সব কর্মী ও শ্রমিকের সমমজুরি, বিশ্রাম, অবসর যুক্তিযুক্ত কর্মঘণ্টাসহ শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার্থে সব অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা কেবল-ই কাগজে কলমে আর ছাপার অক্ষরে বন্দী হয়ে আছে। এই বর্তমান থেকে উত্তরণের জন্য নিবেদিত তরুণ প্রজন্মকে কাজ করতে হবে। নিতে হবে অধিকার আদায়ের দায়িত্ব। তা না হলে ১৯৭১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত যেভাবে অবহেলিত-প্রতারিত হচ্ছে দেশের খেঁটে খাওয়া মানুষেরা; ঠিক একইভাবে আরো শত বছর চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফরমালিন মেশানো রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে যারা তাদের বাবা-স্বামী-নানা-দাদার দেয়া ফরমালিনে বেঁচে আছেন আজ অবধি…
মোমিন মেহেদী : কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ (এনডিবি)